বেদের কয়টি অংশ ও কী কী | বেদের প্রকারভেদ
📌 একনজরে সারসংক্ষেপ:
প্রাচীন ভারতীয় ইতিহাস ও সনাতন ধর্মের সর্বশ্রেষ্ঠ ধর্মগ্রন্থ হলো 'বেদ'। এই বিশাল জ্ঞানভাণ্ডার মূলত চারটি অংশে বিভক্ত, যা বেদের অংশসমূহ নামে পরিচিত। মহর্ষি কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস সংকলিত এই চার বেদ হলো: ঋগ্বেদ (দেবস্তুতি ও প্রাচীনতম পাঠ), সামবেদ (সঙ্গীত ও সুরের আদি উৎস), যজুর্বেদ (যজ্ঞের ক্রিয়াকাণ্ড ও নিয়ম) এবং অথর্ববেদ (চিকিৎসাবিদ্যা ও তন্ত্রমন্ত্র)। ঋগ, সাম ও যজুর্বেদকে একত্রে বেদত্রয়ী বলা হয়।
ভূমিকা
হিন্দু ধর্মের প্রাচীনতম, পবিত্রতম এবং সর্বশ্রেষ্ঠ ধর্মগ্রন্থ হলো 'বেদ'। সংস্কৃত 'বিদ' ধাতু থেকে বেদ শব্দটির উৎপত্তি, যার অর্থ হলো 'জ্ঞান'। হিন্দু বিশ্বাস অনুযায়ী বেদ কোনো সাধারণ মানুষের রচনা নয়, এটি 'অপৌরষেয়' অর্থাৎ ঈশ্বরের মুখনিঃসৃত বাণী। প্রাচীনকালের ঋষিরা গভীর ধ্যানের মাধ্যমে এই মহাজাগতিক জ্ঞান লাভ করেছিলেন এবং তা শ্রুতির মাধ্যমে (শুনে শুনে) শিষ্যপরম্পরায় সংরক্ষণ করেছিলেন। তাই বেদের অপর নাম 'শ্রুতি'।
কালক্রমে মহর্ষি কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস এই বিশাল জ্ঞানভাণ্ডারকে বিষয়বস্তু অনুযায়ী চারটি মূল ভাগে বিভক্ত করেন। প্রাচীন ভারতের রাজনৈতিক, সামাজিক, ধর্মীয় ও অর্থনৈতিক ইতিহাস পুনর্গঠনে বেদের অংশসমূহ বা বৈদিক সাহিত্যের ভূমিকা অপরিসীম।
১. ঋগ্বেদ (Rigveda)
সমগ্র বিশ্বের সাপেক্ষে ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা গোষ্ঠীর প্রাচীনতম সাহিত্য হলো ঋগ্বেদ। সনাতন ধর্মের প্রধান চারটি গ্রন্থের মধ্যে এটি প্রাচীনতম ও সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ।
- গঠন: এতে মোট ১০টি মণ্ডল, ১০২৮টি সূক্ত (১০১৭টি মূল + ১১টি বালখিল্য সূক্ত) এবং ১০,৫৮০টি ঋক (শ্লোক) রয়েছে। সম্পূর্ণ গ্রন্থটি ৮টি 'অষ্টক'-এ বিভক্ত এবং প্রতিটি অষ্টকে ৮টি করে অধ্যায় রয়েছে।
- প্রাচীনতম মণ্ডল: ২য় থেকে ৭ম মণ্ডল সবচেয়ে প্রাচীন, যেগুলোকে 'কুলগ্রন্থ' (Family Books) বলা হয়। এগুলো বিভিন্ন ঋষি বংশের দ্বারা রচিত। ১ম এবং ১০ম মণ্ডল সবচেয়ে শেষে সংযোজিত হয়।
- দেবতাদের স্তুতি: ইন্দ্র (২৫০টি সূক্ত), অগ্নি (২০০টি সূক্ত), বরুণ ও মিত্রের উদ্দেশ্যে স্তুতিগান রচিত। ঋগ্বেদে সবচেয়ে বেশি উল্লেখিত নদী সিন্ধু এবং সবচেয়ে পবিত্র নদী সরস্বতী (নদীতমা)।
- গায়ত্রী মন্ত্র: বিখ্যাত গায়ত্রী মন্ত্র ঋগ্বেদের ৩য় মণ্ডলে স্থান পেয়েছে, যা ঋষি বিশ্বামিত্র সূর্যদেবী সাবিত্রীর উদ্দেশ্যে রচনা করেছিলেন।
- দশরাজন যুদ্ধ (Battle of Ten Kings): ঋগ্বেদের ৭ম মণ্ডলে রাভী (পরুষ্ণী) নদীর তীরে ভরত গোষ্ঠীর রাজা সুদাস ও দশ রাজার কনফেডারেশনের ঐতিহাসিক যুদ্ধের বিবরণ রয়েছে।
- পুরুষসূক্ত ও বর্ণপ্রথা: ঋগ্বেদের ১০ম মণ্ডলের 'পুরুষসূক্তে' সর্বপ্রথম সমাজকে চার বর্ণে (ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্র) বিভাজনের স্পষ্ট উল্লেখ মেলে।
- প্রাচীন যুগে যেসব মুনি-ঋষি ঋগ্বেদের মন্ত্রগুলো আবৃত্তি করতেন, তাঁদেরকে হোত্রী (Hotri) বলা হতো। এই প্রাচীনত্বের কারণেই একে "মানব জাতির আদি আইন" হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়।
২. সামবেদ (Samaveda)
সামবেদকে মূলত 'মন্ত্রবেদ' বা মন্ত্রজ্ঞানের ভাণ্ডার হিসেবে গণ্য করা হয়। প্রাচীনকালে এর নাম ছিল 'সমন', যার আভিধানিক অর্থ হলো সুর বা মেলোডি।
- শ্লোক সংখ্যা: এতে মোট ১৮৭৫টি শ্লোক রয়েছে। এর প্রায় সমস্ত শ্লোকই (মাত্র ৭৫ থেকে ৯৯টি বাদে) ঋগ্বেদের ৮ম ও ৯ম মণ্ডল থেকে সংগৃহীত।
- সঙ্গীতের আদি উৎস: ভারতীয় ধ্রুপদী সঙ্গীত (Classical Music) এবং শাস্ত্রীয় নৃত্যের উৎপত্তি এই সামবেদ থেকেই হয়েছে। ভারতীয় সঙ্গীতের সপ্তস্বর (সা, রে, গা, মা, পা, ধা, নি) প্রথম সামবেদেই উল্লেখিত হয়।
- সামগান: যজ্ঞের সময় সুর করে যে স্তোত্রগুলো গাওয়া হতো, সেগুলোকে 'সামগান' বলা হতো। সামবেদের মন্ত্র আবৃত্তিকারক পুরোহিতকে উদ্গাতা (Udgatri) বলা হয়।
- আনুমানিক ১২০০ থেকে ১০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের মাঝামাঝি সময়ে এটি সংকলিত হয়েছিল।
৩. যজুর্বেদ (Yajurveda)
যজুর্বেদ রচনার সময়কালও আনুমানিক ১২০০ থেকে ১০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ। 'যজুঃ' শব্দটির অন্তর্নিহিত অর্থ হলো— শ্রদ্ধা নিবেদন, পূজা, ধর্মানুশীলন এবং যজ্ঞের সময় পঠিত বিশেষ মন্ত্র বা প্রার্থনা পদ্ধতি। প্রাচীনকালে এই বেদটি 'যজুমষি' নামে পরিচিত ছিল।
- দুটি শাখা: যজুর্বেদ একমাত্র বেদ যা পদ্য ও গদ্য উভয় রীতিতেই রচিত। এর প্রধান দুটি শাখা রয়েছে:
- শুক্ল যজুর্বেদ (বাজসনেয়ী সংহিতা): এটি কেবল মূল বৈদিক মন্ত্রের সুবিন্যস্ত রূপ।
- কৃষ্ণ যজুর্বেদ (তৈত্তিরীয় সংহিতা): এতে মন্ত্রের সাথে সাথে গদ্যে যজ্ঞের ব্যাখ্যামূলক অংশ যুক্ত থাকায় এটি কিছুটা অগোছালো।
- পুরোহিত: যজ্ঞ সম্পন্ন করার সময় যজুর্বেদের নির্দেশ ও মন্ত্র পাঠকারী পুরোহিতকে অধ্বর্যু (Adhvaryu) বলা হতো।
- গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ: প্রাচীন ভারতের অন্যতম প্রধান ঐতিহাসিক ও সামাজিক দলিলের উৎস বিখ্যাত 'শতপথ ব্রাহ্মণ' শুক্ল যজুর্বেদেরই একটি অংশ।
৪. অথর্ববেদ (Atharvaveda)
খ্রিস্টপূর্ব ১২০০ থেকে ১০০০ অব্দের সমসাময়িক সময়ে রচিত অথর্ববেদ দীর্ঘকাল 'বেদত্রয়ী'-র বাইরে ছিল। ঋষি অথর্বা ও অঙ্গিরসের নামানুসারে শুরুতে এর নামকরণ করা হয়েছিল 'অথর্বাঙ্গিরস'।
- বিষয়বস্তু: বিশাল এই গ্রন্থটি ২০টি কাণ্ড (খণ্ড), ৭৩০টি সূক্ত এবং প্রায় ৬,০০০ মন্ত্রে বিভক্ত। অন্যান্য বেদের মতো কেবল দেবস্তুতি নয়, এতে তৎকালীন সাধারণ মানুষের বিশ্বাস, বিভিন্ন রোগমুক্তি, ভেষজ ঔষধ, তান্ত্রিক আচার ও কালাজাদু স্থান পেয়েছে।
- চিকিৎসাবিজ্ঞান: প্রাচীন ভারতের চিকিৎসাবিদ্যা বা আয়ুর্বেদ শাস্ত্রের প্রাথমিক মূল ভিত্তি এই বেদ থেকেই প্রোথিত হয়।
- রাজনৈতিক তথ্য: অথর্ববেদেই বিখ্যাত গণপরিষদ 'সভা' এবং 'সমিতি'-কে প্রজাপতির দুই যমজ কন্যা (Twin daughters of Prajapati) হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে, যা প্রাচীন ভারতীয় রাজনীতির ক্ষেত্রে ডব্লিউবিসিএস ও ইউপিএসসি পরীক্ষার একটি প্রিয় প্রশ্ন।
- পুরোহিত: সম্পূর্ণ যজ্ঞ নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করার তত্ত্বাবধানকারী সর্বোচ্চ পুরোহিতকে ব্রহ্মা (Brahma) বলা হতো, যিনি অথর্ববেদের সাথে যুক্ত।
- উপনিষদ: ভারতীয় জাতীয় প্রতীক বা নীতিবাক্য "সত্যমেব জয়তে" (Satyameva Jayate) গৃহীত হয়েছে অথর্ববেদের অন্তর্গত বিখ্যাত মুণ্ডক উপনিষদ থেকে।
বেদের অভ্যন্তরীণ ৪টি ভাগ
প্রতিটি বেদের বিকাশ চার স্তর বিশিষ্ট। এগুলো পরীক্ষার জন্য গভীরভাবে বোঝা আবশ্যক:
- ১. সংহিতা (Samhita): দেব-দেবীর স্তুতির মূল মন্ত্র ও শ্লোকের সংকলন। এটি কর্মকাণ্ডের প্রথম স্তর।
- ২. ব্রাহ্মণ (Brahmana): জটিল যজ্ঞ, ধর্মীয় আচার এবং সংহিতার মন্ত্রসমূহের গদ্য ব্যাখ্যা ও নির্দেশিকা।
- ৩. আরণ্যক (Aranyaka): মুনি-ঋষিদের অরণ্যে নির্জনে পাঠযোগ্য প্রতীকী ও রহস্যময় দর্শনের সংকলন (কর্মকাণ্ড থেকে জ্ঞানকাণ্ডে রূপান্তরের সেতুবন্ধন)।
- ৪. উপনিষদ (Upanishad): বেদের শেষ বা চূড়ান্ত দার্শনিক অংশ। তাই একে বেদান্ত (Vedanta) বলা হয়। এতে আত্মা, পরমাত্মা ও মোক্ষলাভের গভীর দর্শন বর্ণিত হয়েছে।
একনজরে চতুর্বেদের তুলনামূলক তালিকা
| বেদের নাম | সম্পর্কিত পুরোহিত | উপবেদ (Upaveda) | বিখ্যাত গ্রন্থ / বিশেষত্ব |
|---|---|---|---|
| ঋগ্বেদ | হোত্রী (Hotri) | আয়ুর্বেদ (Ayurveda) | ঐতরেয় ব্রাহ্মণ, গায়ত্রী মন্ত্র, দশরাজন যুদ্ধ, পুরুষসূক্ত। |
| সামবেদ | উদ্গাতা (Udgatri) | গান্ধর্ববেদ (সঙ্গীতকলা) | ছান্দোগ্য উপনিষদ (কৃষ্ণের প্রাচীনতম উল্লেখ ও ৩টি আশ্রমের ধারণা)। |
| যজুর্বেদ | অধ্বর্যু (Adhvaryu) | ধনুর্বেদ (যুদ্ধবিদ্যা) | শতপথ ব্রাহ্মণ, বৃহদারণ্যক উপনিষদ ("তমসো মা জ্যোতির্গময়")। |
| অথর্ববেদ | ব্রহ্মা (Brahma) | শিল্পবেদ বা স্থাপত্যবেদ | মুণ্ডক উপনিষদ ("সত্যমেব জয়তে"), চিকিৎসাবিদ্যা ও তন্ত্রবিদ্যা। |
বিগত পরীক্ষার প্রশ্নোত্তরে বৈদিক সাহিত্য (FAQ)
- ভারতীয় জাতীয় নীতিবাক্য "সত্যমেব জয়তে" কোথা থেকে গৃহীত হয়েছে?
- ভারতের জাতীয় নীতিবাক্য "সত্যমেব জয়তে" অথর্ববেদের অন্তর্ভুক্ত মুণ্ডক উপনিষদ (Mundaka Upanishad) থেকে সংগৃহীত হয়েছে।
- চার বর্ণের (চতুর্বর্ণ) স্পষ্ট উল্লেখ বেদের কোথায় পাওয়া যায়?
- ঋগ্বেদের ১০ম মণ্ডলের পুরুষসূক্তে (Purusha Sukta) সর্বপ্রথম ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র— এই চার বর্ণের সামাজিক বিভাজনের স্পষ্ট উল্লেখ পাওয়া যায়।
- গায়ত্রী মন্ত্র কে রচনা করেন এবং এটি কোন মণ্ডলে রয়েছে?
- গায়ত্রী মন্ত্র ঋগ্বেদের তৃতীয় মণ্ডলে রয়েছে। এটি ঋষি বিশ্বামিত্র সূর্যদেবী সাবিত্রীর উদ্দেশ্যে রচনা করেছিলেন।
- 'সভা' ও 'সমিতি'-কে প্রজাপতির দুই কন্যা বলা হয়েছে কোন বেদে?
- বৈদিক গণতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান 'সভা' ও 'সমিতি'-কে অথর্ববেদে প্রজাপতির দুই যমজ কন্যা রূপে বর্ণনা করা হয়েছে।
- 'দশরাজন যুদ্ধ' বা দশ রাজার যুদ্ধ কোন নদীর তীরে অনুষ্ঠিত হয়েছিল?
- ঋগ্বেদের সপ্তম মণ্ডল অনুসারে দশ রাজার যুদ্ধ বৈদিক পরুষ্ণী (বর্তমান ইরাবতী বা রাভী নদী)-র তীরে রাজা সুদাস ও দশ রাজার মিত্রবাহিনীর মধ্যে সংঘটিত হয়েছিল।
No comments:
Post a Comment
Dont Leave Any Spam Link