ভারতীয় সংবিধানে মৌলিক অধিকার কয়টি ও কী কী? (Fundamental Rights in Bengali)
সংক্ষিপ্ত উত্তর: ভারতীয় সংবিধানে বর্তমানে মোট ৬টি মৌলিক অধিকার রয়েছে। এগুলি হলো— ১. সাম্যের অধিকার, ২. স্বাধীনতার অধিকার, ৩. শোষণের বিরুদ্ধে অধিকার, ৪. ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকার, ৫. সংস্কৃতি ও শিক্ষাবিষয়ক অধিকার এবং ৬. সাংবিধানিক প্রতিবিধানের অধিকার। সংবিধানের তৃতীয় অংশের ১২-৩৫ নং ধারায় এগুলি বর্ণিত আছে।
মৌলিক অধিকার কাকে বলে?
ভারতীয় সংবিধানের তৃতীয় অংশে (Part-III) অন্তর্গত ১২-৩৫ নং ধারায় মৌলিক অধিকার সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। এই অংশটিকে ভারতের 'ম্যাগনাকার্টা' (Magna Carta) বলা হয়ে থাকে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নাগরিকদের মানবাধিকার ও স্বাধীন সত্তা বজায় রাখার জন্য সংবিধানে এই অধিকারগুলো যুক্ত করা হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের 'বিল অফ রাইটস' (Bill of Rights) থেকে এই মৌলিক অধিকারের ধারণাটি গ্রহণ করা হয়েছে।
সাধারণভাবে নাগরিকদের অধিকারসমূহের মধ্যে যেগুলি ব্যক্তিত্ব বিকাশের পক্ষে একান্ত অপরিহার্য সেগুলিকেই মৌলিক অধিকার (Fundamental Rights) বলা যায়। প্রকৃতপক্ষে, মৌলিক অধিকার হল সমাজ কর্তৃক স্বীকৃত ও রাষ্ট্র কর্তৃক বাস্তবায়িত দাবি।
ভারতীয় সংবিধানে বর্তমানে মোট ৬টি মৌলিক অধিকার বর্ণিত রয়েছে। এই অধিকারগুলি হল— সাম্যের অধিকার, স্বাধীনতার অধিকার, শোষণের বিরুদ্ধে অধিকার, ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকার, সংস্কৃতি ও শিক্ষাবিষয়ক অধিকার এবং সাংবিধানিক প্রতিবিধানের অধিকার।
ভারতের সংবিধানে মৌলিক অধিকার গুলো কী কী?
১. সাম্যের অধিকার (১৪-১৮ নং ধারা):
- আইনের চোখে ভারতের সকল নাগরিক সমান।
- কোনো নাগরিককে জাতি, ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ, ভাষা এবং জন্মস্থানের ভিত্তিতে কোনো ভেদাভেদ বা বৈষম্য করা চলবে না।
- সরকারি চাকরিতে সকলের সমান সুযোগ থাকবে এবং অস্পৃশ্যতা বা ছোঁয়াছুঁয়ি প্রথা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
২. স্বাধীনতার অধিকার (১৯-২২ নং ধারা):
- এই অধিকারে সবাইকে বাকস্বাধীনতা, স্বাধীনভাবে কথা বলার, এবং মত প্রকাশের অধিকার দেওয়া হয়েছে।
- সকল নাগরিক দেশের যেকোনো অংশে স্বাধীন ভাবে চলাফেরা করতে এবং বসবাস করতে পারবে।
- যেকোনো পেশা গ্রহণ এবং স্বাধীনভাবে অর্থ রোজগার ও খরচ করার অধিকার থাকবে।
- জীবন ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার অধিকার (২১ নং ধারা): আইন ভঙ্গ না করা পর্যন্ত কোনো নাগরিককে দোষী সাব্যস্ত করা যাবে না এবং একই অপরাধের জন্য কাউকে একাধিকবার শাস্তি দেওয়া যাবে না।
৩. শোষণের বিরুদ্ধে অধিকার (২৩-২৪ নং ধারা):
- ১৪ বৎসরের কম বয়সী কোনো শিশুকে কোনো কারখানায়, খনি বা কোনো ঝুঁকিপূর্ণ কাজে লাগানো যাবে না।
- মানুষ কেনাবেচা (Human Trafficking) অর্থাৎ ক্রীতদাস প্রথা সম্পূর্ণ বেআইনি।
- কোনো ব্যক্তিকে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোরপূর্বক কোনো কাজ করানো যাবে না এবং বিনা পারিশ্রমিকে বেগার খাটানো যাবে না।
৪. ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকার (২৫-২৮ নং ধারা):
- ভারত একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র। তাই প্রত্যেক নাগরিকের নিজের ইচ্ছামতো যে কোনো ধর্ম গ্রহণ, পালন ও প্রচার করার পূর্ণ স্বাধীনতা রয়েছে।
- কোনো ব্যক্তি অন্য ব্যক্তিকে কোনো বিশেষ ধর্ম গ্রহণ করতে বা ধর্মান্তরিত হতে বাধ্য করতে পারবে না।
৫. সংস্কৃতি ও শিক্ষাগত অধিকার (২৯-৩০ নং ধারা):
- ভারতের ভূখণ্ডে বসবাসকারী যেকোনো সংখ্যালঘু সম্প্রদায় (Minorities) তাদের নিজস্ব ভাষা, লিপি ও সংস্কৃতি সংরক্ষণের অধিকার পাবে।
- ধর্ম বা ভাষার ভিত্তিতে সকল সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিজেদের পছন্দমতো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপন ও পরিচালনার অধিকার রয়েছে।
৬. সাংবিধানিক প্রতিবিধানের অধিকার (৩২ নং ধারা):
- এই অধিকারে বলা হয়েছে, রাষ্ট্র বা কোনো ব্যক্তি যদি কোনো নাগরিকের মৌলিক অধিকার খর্ব করে, তবে তিনি সরাসরি সুপ্রিম কোর্ট (৩২ নং ধারা) বা হাইকোর্টের (২২৬ নং ধারা) দ্বারস্থ হতে পারবেন।
- মৌলিক অধিকার বলবৎ করার জন্য আদালত ৫ ধরণের বিশেষ নির্দেশ বা রিট (Writ) জারি করতে পারে (যেমন- বন্দি প্রত্যক্ষীকরণ, পরমাদেশ ইত্যাদি)।
- সংবিধান প্রণেতা ডঃ বি. আর. আম্বেদকর এই ৩২ নং ধারাটিকে সংবিধানের "হৃদয় ও আত্মা" (Heart and Soul of the Constitution) বলে আখ্যায়িত করেছেন।
মৌলিক অধিকারের প্রধান বৈশিষ্ট্য
- আদালত কর্তৃক বলবৎযোগ্য: এই অধিকারগুলো আইনিভাবে সুরক্ষিত। এগুলো খর্ব হলে আদালতের মাধ্যমে বিচার পাওয়া যায়।
- অবাধ বা সীমাহীন নয়: মৌলিক অধিকার অবাধ নয়। দেশের নিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলা বা জনস্বার্থের কথা বিবেচনা করে রাষ্ট্র এর ওপর যুক্তিসঙ্গত বাধানিষেধ (Reasonable restrictions) আরোপ করতে পারে।
- জরুরি অবস্থায় স্থগিত: দেশে জাতীয় জরুরি অবস্থা (National Emergency) ঘোষণা করা হলে, ২০ এবং ২১ নং ধারা ছাড়া বাকি সমস্ত মৌলিক অধিকার সাময়িকভাবে স্থগিত করা যেতে পারে।
গুরুত্বপূর্ণ তথ্য: মূল ভারতীয় সংবিধানে ৭ প্রকারের মৌলিক অধিকারের উল্লেখ থাকলেও ১৯৭৮ খ্রিস্টাব্দে ৪৪তম সংশোধনীর দ্বারা সম্পত্তির অধিকারকে (Right to Property) মৌলিক অধিকার থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে এবং একে একটি সাধারণ আইনি অধিকারে (৩০০এ ধারা) পরিণত করা হয়েছে。
💡 সচরাচর জিজ্ঞাস্য প্রশ্নোত্তর (FAQ)
১. মৌলিক অধিকার কাকে বলে?
সাধারণভাবে নাগরিকদের অধিকারসমূহের মধ্যে যেগুলি ব্যক্তিত্ব বিকাশের পক্ষে একান্ত অপরিহার্য সেগুলিকেই মৌলিক অধিকার বা Fundamental Rights বলা যায়। এটি সংবিধানের ৩য় অংশে বর্ণিত।
২. ভারতের মৌলিক অধিকার কয়টি ও কী কী?
বর্তমানে ভারতের সংবিধানে মোট ৬টি মৌলিক অধিকার রয়েছে। এগুলো হলো- সাম্যের অধিকার, স্বাধীনতার অধিকার, শোষণের বিরুদ্ধে অধিকার, ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকার, সংস্কৃতি ও শিক্ষাবিষয়ক অধিকার এবং সাংবিধানিক প্রতিবিধানের অধিকার。
৩. সংবিধানের কোন অংশকে ভারতের ম্যাগনাকার্টা বলা হয়?
ভারতীয় সংবিধানের তৃতীয় অংশকে (Part III), যেখানে মৌলিক অধিকার বর্ণিত রয়েছে, ভারতের ম্যাগনাকার্টা (Magna Carta) বলা হয়。
৪. সম্পত্তির অধিকার কি মৌলিক অধিকার?
না, ১৯৭৮ সালে ৪৪তম সংবিধান সংশোধনীর মাধ্যমে সম্পত্তির অধিকারকে মৌলিক অধিকারের তালিকা থেকে বাদ দিয়ে একটি আইনি অধিকারে পরিণত করা হয়েছে。
৫. জরুরি অবস্থার সময় কি মৌলিক অধিকার বাতিল হয়?
জাতীয় জরুরি অবস্থার সময় ২০ এবং ২১ নং ধারা (জীবন ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার অধিকার) বাদে অন্যান্য মৌলিক অধিকারগুলি সাময়িকভাবে স্থগিত করা যেতে পারে。